একজন শহীদ রাজীব বড়ুয়াকে কেন ভুলে গেলাম?


রাজীব বড়ুয়া, মনে হচ্ছে নামটা কোথায় যেন শুনেছি, ঠিক মনে করতে পারছিনা।

হ্যাঁ আমি সেই রাজীব এর কথা বলছি, চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার আবুরখীল গ্রামের সন্তান যার দুচোখ ভরে স্বপ্ন ছিলো,মা,বাবার আদুরে সন্তান কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে,তার পর দরিদ্র পরিবারের হাল ধরা সেই দুরন্ত ছেলে দেশের সেবার ব্রত নিয়ে যোগ দিলেন বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে কর্তব্য ও দায়িত্ব সততা, নিষ্ঠার সাথে পালন করতে গিয়ে নির্মম ভাবে আত্নহুতি দিলেন কনেষ্টেবল রাজীব।

তার মৃত্যুটা কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু ছিলোনা, ২০০৫ সালের  ১৯ নভেম্বর সকাল বেলা ডিউটি ছিলো চট্টগ্রামের কোর্ট বিল্ডিং চত্বরে।তখন ক্ষমতায় বি,এন,পি জোট সরকার।তখন সময়টা বড় অদ্ভুত।সমগ্র দেশ জুড়ে অসহিষ্ণুতার বিষ বাষ্প।হানাহানি,সংঘাত, রক্তপাত সব কিছু সংগঠিত হচ্ছিল ধর্মের দোহাই দিয়ে।ধর্মের নামে ধর্মান্ধরা সমগ্র দেশ কে বধ্যভূমিতে পরিণত করেছিলো।জল্লাদ খানায় পরিণত করে সমগ্র দেশ কে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছিলো।তখন অরাজকতা বিশৃঙ্খলতা বিরাজ করছিলো সমগ্র দেশজুড়ে।তৎকালীন সরকারের গোপন পৃষ্ঠপোষকতায় যেনো বেড়ে ওঠছিলো জে,এম,বি,হরকাতুল-জিহাত আল্-ইসলাম সহ অনেক জঙ্গি সংগঠন। তাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্যে ছিলো তথাকথিত তাদের মনগড়া শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠা করা। তারই ধারাবাহিকতায় সেদিন জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা ও লক্ষ্যবস্তু ছিলো চট্টগ্রাম জর্জ কোর্টের মননীয় বিচাকর বৃন্দ। সুইসাইড স্কোয়াডের জঙ্গি সদস্যকে সেদিন হাতেনাতে ধরতে সক্ষম হন রাউজানের আবুরখীলের জন্মজাত সন্তান পুলিশ বাহিনীর অকুতোভয় সৈনিক শহীদ কনেষ্টেবল রাজীব বড়ুয়া। রাজীব সেদিন তার জীবন বিসর্জন দিয়ে রক্ষা করেছিলো অনেক বিচারক ও নিরহ প্রান।সেদিন যদি কাপুরুষের মত নিজেকে গুটিয়ে রখতো তাহলে ঘটনাটা অন্য রকম হতে পারতো,হতে পারতো রক্তাক্ত এক ট্র্যাজেডির নাম চট্টগ্রাম।  তৎকালীন সরকার তাকে শহীদ উপাধীতে ভূষিত করেন।তার পরিবারকে আর্থিক কিছু অনুদান দেন।এখানেই শেষ।

ঘটনার দিন সকাল ১১টায় আমি ও আমার কর্মচারী কোর্ট বিল্ডিং এর নিচে তৎকালীন কর এন্ড  কোম্পানির সামনে হেঁটে যাচ্ছিলাম কর্মস্থল পাথর ঘাটা থেকে।হঠাৎ বিকট শব্দে হত-বিহবল হয়ে পড়ি।তারপর চারিদিকে মানুষের দৌড়া-দৌড়ি সবাই বলছে জঙ্গি হামলা হয়েছে।এক পুলিশ সদস্য মারা গেছেন আর অসংখ্য লোক আহত হয়েছে। ঘরে যখন আসলাম কে যেনো মোবাইলে ফোন দিয়ে জানালো,যে পুলিশ সদস্যটি মারা গেলো সে আবুরখীলের শিমুল কাকার সন্তান রাজীব।সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম মেডিকেলের মর্গে ছুটে গেলাম। দেখলাম সুন্দর ফুটফুটে সুদর্শন রাজীবের ছিন্ন ভিন্ন নিথর দেহ পড়ে আছে।

আজ সকালে বিশেষ একটা কাজে কোর্ট বিল্ডিং সোনালী ব্যাংকের সামনে দাঁড়াতেই চোখে পড়লো শহীদ রাজীবের স্মৃতি স্তম্ভের দিকে।মনটা হুহু করে ওঠলো। এটি সেই স্থান যেখানে রাজীব জীবন দিয়ে বাঁচিয়ে গেছে অসংখ্য প্রাণ।মলিন হয়ে আছে সেই স্মৃতির স্মৃতিস্তম্ভ, কোন্ কারনে এ অবহেলা? এ কোন্ ধরনের অপমান অবমাননা?অযত্ন অবহেলায় পড়ে আছে স্মৃতি স্তম্ভটি।রাজীবের নামটি পর্যন্ত মুছে গেছে।সামনে বসেছে লুঙ্গির দোকান আর লুঙ্গি বিক্রেতার সেন্ডেল জোঁড়া শহীদ বেদীর নিচে সযত্নে লুকিয়ে রেখেছে খবরের কাগজে।

এভাবেই কি শহীদের আত্নত্যাগ বৃথা যাবে?তাহলে কি নিরবে নিবৃত্তে কেঁদে যাবে শহীদ রাজীবের অতৃপ্ত আত্মা? রাজনৈতিক মত পার্থক্য থাকতেই পারে কিন্তু বীরশহীদ,স্বাধীনতা,দেশের স্বার্থে সবাই এক এবং অভিন্ন।

পুলিশ প্রশাসন সহ সর্বস্তরের কাছে আকুল আবেদন রাজীবে’র স্মৃতিস্তম্ভটি পূর্ণসংস্কার করা হোক।সময়ের জোড় দাবী নতুন প্রজন্ম জানুক।সরকারের সুদৃষ্টি কমনাই হোক শহীদ রাজীবের পরিবার সহ সমগ্র আবুরখীল বাসীর।

লেখকঃ স্বরূপ বিকাশ বড়ুয়া বিতান

0Shares