বাঁশখালীর কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিক আন্দোলন: দুই মামলায় আসামি সাড়ে তিন হাজার


চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গণ্ডামারায় এস আলমের মালিকানাধীন কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের শ্রমিক আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে পাঁচজন নিহতের ঘটনায়  শ্রমিকদের নামে দুইটি মামলা দায়ের হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ একটি আর পুলিশ অন্য মামলাটি করে। দুই মামলায় ২২ জনের নাম উল্লেখসহ অন্তত অজ্ঞাত সাড়ে ৩ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে।

রোববার ভোরে চট্টগ্রামের বাঁশখালী থানায় এ মামলাগুলো দায়ের করা হয়। থানার এক এসআই বাদি হয়ে পুলিশের দায়িত্ব পালনে বাধা, হামলার অভিযোগ দায়ের করা মামলায় অজ্ঞাত আড়াই হাজার জনকে আসামি করা হয়। অন্যদিকে এসএস পাওয়াপ্ল্যান্টের চীফ কোর্ডিনেটর ফারুক আহমেদ ২২ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ১ হাজার ৫০ জনকে আসামি করে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুরের একটি মামলা করেন।

বাঁশখালী থানা ওসি শফিউল কবীর বলেন, মামলা হয়েছে। এখন তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে বাঁশখালীর গণ্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষে নিহত ৫ জনের ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।  রোববার বিকেল পৌনে ৪টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহগুলো হস্তান্তর করা হয়।

এর আগে গত ১৭ এপ্রিল সকাল থেকে ১২ দফা দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে ডাকে বিদ্যুৎ নির্মাণ কর্তৃপক্ষ। আন্দোলন বেলা পৌনে ১২টার দিকে উত্তপ্ত হয়ে উঠে যখন পুলিশ বিক্ষোভকারীদের জোর করে দমাতে যায়। এরপরই শ্রমিকরা একত্রিত হয়ে পুলিশের ওপর হামলা করলে পুলিশও তাদের ওপর গুলি চালায় এতে ঘটনাস্থলেই চারজন ও চমেক হাসপাতালে একজন নিহত হয়। আহত হয় অন্তত আরও ১৭ জন। এছাড়া আহত হয় তিন পুলিশ সদস্যও। ওই দিন জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চার সদস্যের এবং পুলিশের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। জেলা প্রশাসনের কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে এবং পুলিশের তদন্ত কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, শ্রমিকদের আন্দোলন ও হামলার ঘটনার জন্য স্থানীয়রা ২০১৬ সালের আন্দোলনের হোতা গণ্ডমারার চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা লিয়াকত আলীর ইন্ধন থাকার কথা বললেও তাকে আসামি করা হবে কিনা তার জন্য রাতভর দফায় দফায় বৈঠক করেও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি পুলিশ। অবশেষে ভোর রাতে তাকে বাদ দিয়েই এই মামলা দুটি করে। শ্রমিক নিহত ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গত শনিবার থেকে এসএস পাওয়ার প্ল্যান্ট বন্ধ রয়েছে। চীনা নাগরিকরা নিরাপদে রয়েছে। সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়ন করা হয়েছে বলেও জানান ওসি বাঁশখালী।

এদিকে পাওয়ার প্লান্টের বকেয়া বেতন-ভাতাসহ ৪ দফা  দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর বর্বরোচিত পুলিশি হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদে রোববার বিকাল ৫ টায়  চেরাগি পাহাড় চত্বরে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, চট্টগ্রাম জেলা।

বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি রিপায়ন বড়ুয়ার সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন সহসভাপতি শ্যামল লোধ, সহকারী সাধারণ সম্পাদক জাবেদ চৌধুরী, রুপন কান্তি ধর,  সাংগঠনিক সম্পাদক রাশিদুল সামির, টুটন দাশ, বিপ্লব দাশ, জুয়েল বড়ুয়া,  মিঠুন বিশ্বাস, রবি শংকর সেন প্রমুখ

বক্তারা বলেন, এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ার লিমিটেড চীনের দুটি প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সহযোগিতায় গন্ডামারা ইউনিয়নে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হয়েছে। এখানে শ্রমিক সরবরাহ করে তৃতীয় একটি কোম্পানি। এ কোম্পানী শ্রমিকদেরকে দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা নিয়ে অনিয়ম করছে। গত শনিবার সকাল ১০টার দিকে বকেয়া বেতন পরিশোধ, বেতন বাড়ানো, শুক্রবারে জুমার দিন হওয়ায় এক বেলা কাজ করা সহ ৪ দফা দাবিতে শ্রমিকরা কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলতে গেলে তর্কাতর্কি হয়। সেসময় কর্তৃপক্ষ পুলিশকে খবর দেয়। এ করোনা মহামারীর মধ্যেই আনোদলনরত শ্রমিকদের উপর পুলিশ শ্রমিকদের নিপীড়নে নেমে পড়ে। পুলিশের গুলিতে ৫ জন নিহত এবং ২৩ জন আহত হয়েছে। শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে পুলিশের এই বর্বরোচিত হামলা কোনো ভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

তাঁরা বলেন, শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও অন্যান্য পাওনাদি পরিশোধে গড়িমসি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। শ্রমিকরা শতভাগ ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন করছেন। অথচ বেতন-ভাতা পরিশোধ করার বদলে বিক্ষোভে গুলি করে শ্রমিকদের দাবি আদায়ের ন্যায্য অধিকারটুকু কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। শ্রমিকদের হয়রানি – নির্যাতন করে মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

বক্তারা আরো বলেন, অবিলম্বে এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানান। শ্রমিকদের ওপর হামলা, হয়রানি বন্ধ ও সব শ্রমিকের বকেয়া বেতন অবিলম্বে পরিশোধ করারও দাবি জানান তাঁরা। লুটেরা-ব্যবসায়ী শ্রেণির স্বার্থে পুলিশ বাহিনীকে দলীয় ক্যাডারের মতো ব্যবহার করে জনগণের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং দেশকে একটি পুলিশি ভীতিকর রাষ্ট্রে পরিণত করে সরকার এটা প্রমাণ করেছে যে এ সরকার  শ্রমিকবান্ধব নয়। গণবিচ্ছিন্ন, কর্তৃত্ববাদী অনৈতিক সরকার কখনো শ্রমিকদের পক্ষে কোনো দাবিকেই তোয়াক্কা করে না।

নিজস্ব প্র্রতিবেদক, ফোকাস চট্টগ্রাম ডটকম

0Shares