মৃত্যু বাড়িতে শোকের বন্যা শান্তনার বৃষ্টি নেই


দুঃসহ এক যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছি প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে।  বিবেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছি। প্রতিদিন কোন না কোন দুঃসংবাদ আসছে।  বন্ধু-স্বজন, পরিচিতজন, আত্মীয়- অনেকেই  নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন কেউ কেউ। কেউ বা মারা যাচ্ছেন করোনা উপসর্গ নিয়ে। কেউ বা করোনা আক্রান্ত হয়ে। আক্রান্ত কেউ থাকছেন আইসোলেশনে বাসা বাড়িতে। কেউবা হাসপাতালের বেডে। করোনাকালে আপনজনের আক্রান্ত হওয়া ও বিদায় নেওয়ার দুঃসংবাদের সঙ্গে বসবাস করছিতো বটেই। পেশাগত কারণে প্রতিদিন কত মৃত্যু, কত যন্ত্রণার খবর লিখছি। বেসরকারি হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসা না পাওয়ার যন্ত্রণা, চট্টগ্রামে ভর্তি হতে না পেরে ঢাকায় স্বজনকে নিয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা, ভাইকে শেষ মুহূর্তে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে না পারা ভাইয়ের যন্ত্রণা, দুর্ঘটনায় আহত ছোট্ট শিশুকে বুকে  জড়িয়ে এ হাসপাতাল থেকে ও হাসপাতালে দৌড়ে মৃত্যুর কাছে সঁপে দেওয়ার যন্ত্রণা- আরো কত কী।

বন্ধু-স্বজনের অসুস্থতায় দাঁড়াতে পারছি না হাসপাতালে কিংবা শয্যাপাশে গিয়ে। শেষ বিদায়ের আগে কাছে যেতে পারছি না।  ছুঁয়ে দিতে পারছি না কপালে।  লাশের পাশে গিয়ে ফেলতে পারছি না দু’ফোঁটা চোখের জল। নামাজে জানাজায় গিয়ে দু’হাত তুলে মুনাজাত করতে পারছি না। স্রষ্টার কাছে জানাতে পারছি না বেহেস্তের আকুতি।  একজনের বিদায়ের বেদনা না ভুলতেই কখন আরেকজনের বিদায়ের খবর আসছে। হাসপাতালের বিছানায় অক্সিজেনের অভাবে শ্বাসকষ্টে ভুগছে কোন স্বজন। কিংবা চিকিৎসকদের সব চেষ্টা বিফল করে দিয়ে আবার বিদায় নিচ্ছে কোন বন্ধু; সে চিন্তায় অধীর-অস্থির হচ্ছি।  যারা যাচ্ছে তারাতো যাচ্ছেই। পৃথিবীর আলো-হাওয়ায় নিজেই বা কতদিন আছি। পৃথিবীটা কেন এমন এলোমেলো হয়ে গেল।

মেট্রোপলিটন হাসপাতালের চিকিৎসক পরোপকারি  বন্ধু ডা. নুরুল হক করোনা উপসর্গ নিয়ে দু’দিন আইসিইউতে থাকার পর বুধবার ভোরে মারাই গেলেন। মাত্র ৪৩ বছর বয়সে। দুই অবোধ শিশু সন্তান রেখে।  আপনজন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মহিসন খাঁন বিএসসি চট্টগ্রামের বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হতে না পেরে চলে গিয়েছিলেন ঢাকায়। এক সপ্তাহ লড়াই করে বুধবার ভোরে তিনিও মারা গেলেন সিকদার মেডিকেলে। মৃত্যুর কাছে হেরে গেলে জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তান।

ঈদের আগে মার্কেট খোলা রাখার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন তামাকুমুন্ডি লেন বণিক সমিতির সভাপতি শামসুল আলম। জানিয়েছিলেন করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে তারা ঈদের আগে শপিং মল খুলবেন না। কথা রেখেছেন। কিন্তু করোনার কাছে হার মানলেন তিনি নিজেই।  একইভাবে টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি পরিচিতজন ওসমান গণি চৌধুরী অঘোষিত লকডাউনের কারণে সাতকানিয়ার বাড়িতে গিয়ে আর ফিরলেন না। মারাই গেলেন। টেরিবাজার মেগামার্টের মালিক আবদুল মান্নান বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছেন না। শ্বাসকষ্ট থাকায় তাকে কোন হাসপাতাল ভর্তি নিচ্ছে না। টেরিবাজার ব্যবসায়ি সমিতির সাধারণ সম্পাদক প্রিয় স্বজন আবদুল মান্নান এমন অভিযোগই করলেন। হাসপাতালে ভর্তি হতে না পেরে শেষ পর্যন্ত বাসায় নিয়ে  যাওয়া হয় ওই ব্যবসায়িকে। এই  অবহেলার প্রতিবেদন ছাপা হয় যুগান্তরে। কিন্তু এর আগে রাতেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান হতভ্যাগ্য সেই ব্যবসায়ী।   ফুফাতো বোনের স্বামী ব্যবসায়ী আবদুল হক মারা গেলেন একদিনের জ্বরে। আরামিট গ্রুপ থেকে সদ্য অবসর নেওয়া এক মামা (দিদারুল হক)  ৫-৭ দিনের জ্বরে কাবু হয়ে মারা গেলেন। আদালত ভবনের  চেনা মুখ অ্যাডভোকেট আবুল কাশেম চৌধুরী মারা গেলেন হাসপাতালে ভর্তি হতে না পেরে। ইউসিবিএল ব্যাংকের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ভাই ইউসুফ চৌধুরীর সে কী করুণ আফসোস ভাইয়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা  করতে না পারায়। এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের বড় ভাই মোরশেদুল আলমের বিদায়তো ইতিহাস হয়েই থাকলো। ছোটভাইয়ের অক্সিজেন খুলে দেওয়া হলো বড় ভাইকে। তবুও বাঁচানো গেলো না। এভাবে আর কত মৃত্যু, আর কত যন্ত্রণা, আর কত অভিশাপ বয়ে বেড়াতে হবে আমাদের!

অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন সহকর্মি সাংবাদিক অনিন্দ্য টিটু, এর আগে করোনা  আক্রান্ত হয়ে ১৪ দিন আইসোলেশনে ছিলেন প্রেস ক্লাব সাধারণ সম্পাদক অগ্রজ চৌধুরী ফরিদ, ইনডিপেন্ডেন্ট টিভির বন্ধু আহসানুল কবির রিটনও আক্রান্ত হয়ে ঘরবন্দি ছিলেন।  অনেক সাংবাদিক বন্ধু, ছোট ভাই, বড় ভাই আত্মীয়-স্বজন নানাভাবে অসুস্থতায় ভুগেছেন। সাংবাদিকতা পেশার কারণে পরিচিতজন কিংবা সুহৃদের তালিকাটাও দীর্ঘ। এ কারণে করোনার এই দুঃসময়ে আপনজনের দুঃসংবাদের তালিকাটাও যেন দীর্ঘ হচ্ছে। কিন্তু পাশে যেতে পারছি না। কাছে থাকতে পারছি না।  ভার্চুয়াল খোঁজ-খবর নেওয়াই যেন সার।

করোনায় কে কখন আক্রান্ত হচ্ছেন তার কোন হিসেব নেই। কার কাছ থেকে কে আক্রান্ত হবেন তারও কোন হিসেব নেই। এর পরও অন্যের কাছ থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখতে আবার নিজের কাছ থেকে অন্যকে  নিরাপদ রাখতে মানতে হচ্ছে দূরত্ব বিধি।  মানবিক সমাজে এ যেন এক ‘নিষ্ঠুরতা’। করোনা আমাদের এমনই নিষ্ঠুর করেছে। স্বজনদের কাছ থেকে দূরে রেখেছে। কখন ঘুচবে এই দূরত্ব। অসুস্থ স্বজনের কাছে গিয়ে ভরসা হয়ে, সাহস হয়ে দাঁড়াতে পারবো আমরা।  স্বজনের মৃত্যুবাড়িতে আবার কখন  বইবে শোকের বন্যা। ঝরবে শান্তনার বৃষ্টি। কখন থামবে এমন দূরত্ব মানার মৃত্যু। কখন ভাঙ্গবে কাছে যেতে না পারার  স্বচ্ছ এই কাচের দেওয়াল ???

পুনশ্চ:  বুধবার রাত সাড়ে আটটায় এই লেখাটি শেষ করে যেই কম্পিউটার বন্ধ করবো- ঠিক তখন খবর এলো শিকলবাহা ইউনিয়ন পরিষদের তিন বারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান লালদিঘি পাড়ে পরিবহন শ্রমিকদের বহু দিনের জনপ্রিয় নেতা আবুল কালাম বকুলও পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে  গেছেন। মেট্রোপলিটন হাসপাতালে বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টায় তার মৃত্যু হয়।

লেখক: শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, ব্যুরো প্রধান, দৈনিক যুগান্তর, চট্টগ্রাম ব্যুরো।

0Shares