২০২২ সালের মধ্যে নতুন কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন হবে: রেলমন্ত্রী


রেলপথ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেছেন, চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী নদী কর্ণফুলী। এ নদীর ওপর কালুরঘাট সেতুটি রেল কাম সড়ক সেতু করার মানুষের যে দাবি তা শিগগিরই পূরণ হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রী আমাকে জানান, সেতুটি রেল কাম সড়ক সেতু করার উদ্যোগ নিয়েছেন।২০২২ সালের মধ্যে নতুন কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন হবে।

বুধবার (৭ অক্টোবর) সকাল ১১টায় কালুরঘাট সেতু পরিদর্শন শেষে তিনি এ কথা বলেন।

তিনি আরো বলেন, সেতুর অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে কোরিয়ার প্রকৌশলী টিমের সঙ্গে কথা বলি, তারা পরিদর্শনে এসে প্রথমে সেতুটি করবে বলে জানালেও কিছুদিন পর জানায়-তারা সেতুর কাজ করবে না। একপর্যায়ে আমি আবারও বৈঠকে বসলে তারা জানায়, রেলসেতু ও সড়ক সেতু আলাদা করতে হবে। বিষয়টি নিয়ে আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলাদা সভায় ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করি। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে কোরিয়ার প্রস্তাবনা তুলে ধরি। তখন প্রধানমন্ত্রী আমাকে জানান, আলাদা সেতু নয়। সেতুটি হবে রেল কাম সড়ক সেতু।

রেলপথ মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক রেল কাম সড়ক সেতু করার উদ্যোগ নিয়েছি। সে লক্ষ্যে পুরনো সেতুটি পরিদর্শনে আসা। আশা করছি ২০২২ সালের মধ্যে নতুন কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন করতে পারবো। এতদিনও সেতুর কাজ না হওয়ায় আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। তিনি বলেন, সেতুর ওপর হবে দুই লাইনের সড়ক। রেললাইনটি হবে ডুয়েলগেজের। সেতুটি হলে ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে রেল যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হবে।

কালুরঘাটে সড়ক কাম রেল সেতুর প্রস্তাবিত নকশা নিয়ে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের সাথে রেলওয়ের যে সংকট চলছে তা অচিরেই নিরসন হবে বলে জানিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন। সেটা আগামী ১৫ দিনের মধ্যেই কেটে যাবে এবং তাদের আপত্তির প্রেক্ষিতে প্রস্তাবিত ৭ দশশিক ২ মিটার থেকে ৯ মিটার পর্যন্ত রেলওয়ে সেতুটি উচু করা হতে পারে বলেও জানান তিনি।

এরআগে মন্ত্রী সকাল ১০ টার পর পায়ে হেঁটে কালুরঘাট সেতু পরিদর্শন করেন। এসময় মন্ত্রীর সঙ্গে স্থানীয় এমপি মোছলেম উদ্দিন আহমদসহ রেলওয়ে ও প্রশাসনের উধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরে বোয়ালখালী উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে এক পথসভাতেও বক্তব্য রাখেন মন্ত্রী।

রেলপথ মন্ত্রী বলেন, কালুরঘাটের বর্তমান সেতুর উজানেই নতুন করে সড়ক কাম রেল সেতুটি হবে। সব কিছু ঠিক হলেও নৌপরিবহন অধিদপ্তর উচ্চতা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। তারা তৃতীয় কর্ণফুলী সেতুটির সমান ১২ দশমিক ২ মিটার উচ্চতা চায়। আর প্রস্তাবিত সেতুটি ৭ দশমিক ২ মিটার। তাই একটু জটিলতা তৈরি হয়। আমরা যৌথ কারিগরী টিম গঠন করেছি, তারা কাজ করছে। নতুন সেতুটি ৯ মিটার পর্যন্ত উচু করার সুযোগ আছে। তাদের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধান করা হবে। এটি ডাবল লাইন সড়ক ও এক লাইন রেল পথের সেতু হবে। ১২০ কিলো স্প্রিডে ট্রেন চলবে আর  ৬০ কিলো স্প্রিডে গাড়ি চলতে পারবে। সেতুটির মোট প্রস্থ হবে ২০ ফুট।

ব্যয় প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ২০১৮ সালে এ সেতুর ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০০ মিলিয়ন ডলার। এখন হয়তো সামান্য বাড়বে। আর এটি কোরিয়ান দাতা সংস্থা ও সরকার যৌথভাবে অর্থয়ান করবে।

মন্ত্রী আজকে কালুরঘাট সেতু এলাকা পরিদর্শন শেষে সার্কিট হাউজে যাত্রা বিরতি করেন। বিকাল সাড়ে ৩টায় বাংলাদেশ রেলওয়ের পাহাড়লীস্থ প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় পরির্দশন করেন। সেখান থেকে সাড়ে ৪টায় মন্ত্রী পাহাড়তলীস্থ ডিজেল ওয়ার্কসপে যান। সেখানে নতুন আমদানিকৃত ১০টি এমজি ডিজেল লোকোমোটিভ সরেজমিনে পরির্দশন করেন।

উল্লেখ্য, রেলওয়ের প্রস্তাবিত নকশায় নদীপৃষ্ঠ থেকে সেতুর উচ্চতা ধরা হয়েছে সাড়ে ৭ মিটার। তবে নদীপৃষ্ঠ থেকে সেতুর উচ্চতা ১২ মিটার করার শর্ত দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। বিআইডব্লিউটিএর আপত্তির পর ইতোমধ্যে উচ্চতা বৃদ্ধির বিষয়ে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে রেলওয়ে। কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন শেষে প্রতিবেদন জমা দিলে বিআইডব্লিউটিএ’র সঙ্গে বসে বিষয়টি মীমাংসা করা হবে। তাদের শর্ত পূরণ করে নকশা তৈরির কাজও করছে রেলওয়ে।

মূলত রেল কর্তৃপক্ষ ডাবল রেললাইন এবং দুই লাইনের রোড করার জন্য নকশা তৈরি করে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত দ্য ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ডের (ইডিসিএফ) কাছে পাঠিয়েছিল। দক্ষিণ কোরিয়া এই নকশা পাওয়ার পর রেল কর্তৃপক্ষের কাছে বেশ কিছু টেকনিক্যাল বিষয়ের ওপর মতামত জানতে চেয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষ যে নকশা করেছে তাতে সেতুটি অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে সেতুর স্থায়িত্ব কমে যাবে বলে মনে করছে ইডিসিএফ কর্তৃপক্ষ। এই কারনে সেতু নির্মাণ এখন দীর্ঘসুত্রতায় পড়েছে। ১৯৩১ সালে কালুরঘাট সেতুটি মিটার গেজ লাইন বিশিষ্ট রেল সেতু হিসেবে নির্মিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে সড়ক সেতু যুক্ত করে রেল কাম সড়ক সেতুতে রূপান্তরিত করা হয়। বর্তমানে সেতুটি জরাজীর্ণ অবস্থায় আছে। এটি নির্মিত হলে নিরবচ্ছিন্ন রেল পরিবহন সেবা নিশ্চিত করা যাবে এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার করিডোরের অপারেশনাল বাধা দূর করা যাবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনমান উন্নত করা এবং আঞ্চলিক বিনিময় সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হবে। মাতারবাড়ি গভীর সমদ্র বন্দরের জন্য বৃহত্তর করিডর তৈরি হবে, বাণিজ্যিক রাজধানীর যানজট হ্রাস পাবে, ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের  অংশবিশেষ হিসেবে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফোকাস চট্টগ্রাম ডটকম

0Shares